দৈনিক প্রথম সংবাদ

ফুসফুস ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায় যেসব খাবার

ফুসফুস ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায় যেসব খাবার
অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার

ধূমপান দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুস ক্যানসারের প্রধান কারণ হিসেবে পরিচিত। তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, ধূমপান না করলেও শুধু খাদ্যাভ্যাসের কারণেই ফুসফুস ক্যানসারের ঝুঁকি ৪১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
গবেষণাটি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হেলথ অ্যান্ড নিউট্রিশন একজামিনেশন সার্ভে-এর তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে পরিচালিত হয় এবং এর ফলাফল প্রকাশ করেছে সিএনএন ও জাতিসংঘের ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন (FAO)।

অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার: নীরব ঘাতক

বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার (Ultra-processed foods) হলো সেইসব খাবার, যেগুলোতে থাকে এমন উপাদান যা সাধারণ রান্নাঘরে ব্যবহার করা হয় না।
এই খাবারগুলোতে সাধারণত পাওয়া যায় –
  • কৃত্রিম রং ও ঘ্রাণ
  • সংরক্ষক পদার্থ
  • স্বাদ বাড়াতে রাসায়নিক সংযোজন
  • ইমালসিফায়ার
  • পরিবর্তিত চিনি, লবণ ও চর্বি
এই উপাদানগুলো সাধারণত দেখা যায় সফট ড্রিংকস, প্যাকেটজাত স্যুপ, চিপস, আইসক্রিম, সসেজ, ফাস্ট ফুড, এবং চিকেন নাগেটস–এর মতো খাবারে।

গবেষণার ফলাফল কী বলছে

গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দিনে তিনবারের মতো প্রক্রিয়াজাত খাবার খান, তাদের ফুসফুস ক্যানসারের ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি।
এমনকি বয়স, ওজন বা ধূমপানের ইতিহাস বিবেচনায় নেওয়ার পরও এই ঝুঁকি থেকে যায়।
গবেষকরা বলছেন, এই ধরনের খাবার প্রক্রিয়াজাত করার সময় অ্যাক্রোলিন (Acrylin) নামক একটি ক্ষতিকর রাসায়নিক তৈরি হয়, যা সাধারণত তামাক, কাঠ বা রান্নার তেল পোড়ালে উৎপন্ন হয়। এই রাসায়নিক শরীরের কোষে বিষক্রিয়া ঘটিয়ে ক্যানসার সৃষ্টিকারী পরিবর্তন ঘটাতে পারে।

ধূমপান নয়, খাদ্যও হতে পারে ঝুঁকির কারণ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৪ লাখ মানুষ ফুসফুস ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন।
টাফটস ইউনিভার্সিটির ড. ফাং ফাং ঝ্যাং
বলেন,
“ধূমপান নিঃসন্দেহে ফুসফুস ক্যানসারের প্রধান কারণ, তবে আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, ধূমপান না করেও শুধুমাত্র অস্বাস্থ্যকর খাবারের কারণে অনেকেই এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।”
আরেক বিশেষজ্ঞ ড. ডেভিড কাটজ জানান,
“অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারে স্যাচুরেটেড ফ্যাট, চিনি ও লবণ এত বেশি থাকে যে তা শরীরে প্রদাহ সৃষ্টি করে। দীর্ঘ সময় এই প্রদাহ থাকলে ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়।”

শরীরে কীভাবে ক্ষতি করে এই খাবার

অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার শুধু ক্যানসার নয়, বরং শরীরের মাইক্রোবায়োম নষ্ট করে দেয়, যার ফলে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায়।
টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. টম ব্রেনা
বলেন,
“এই খাবারগুলোতে ওমেগা–৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ খুব কম থাকে, অথচ এটি শরীরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাবারের শেলফ লাইফ বাড়াতে গিয়ে ওমেগা–৩ বাদ দেওয়া হয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য বড় ক্ষতি।”

সুস্থ থাকতে কী খাবেন

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, ফুসফুসসহ সার্বিক শরীরের সুস্থতার জন্য যতটা সম্ভব প্রাকৃতিক ও কম প্রক্রিয়াজাত খাবার বেছে নিতে হবে।
যে খাবারগুলো খাওয়া উচিত:

  • তাজা শাকসবজি ও ফল
  • গোটা শস্য (যেমন লাল চাল, ওটস, গম)
  • ডাল, বাদাম ও বীজজাতীয় খাবার
  • পর্যাপ্ত পানি ও ঘরে তৈরি খাবার
যে খাবারগুলো এড়িয়ে চলা উচিত:
  • সফট ড্রিংকস ও ইনস্ট্যান্ট পানীয়
  • প্যাকেটজাত বা ফ্রোজেন ফুড
  • চিপস, বার্গার, পিজ্জা, সসেজ
  • অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও তেল

ছোট পরিবর্তনেই বড় ফলাফল

একদিনে পুরো খাদ্যাভ্যাস বদলানো সম্ভব নয়। তবে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনলেই শরীরে ইতিবাচক প্রভাব দেখা যায়।

গবেষকরা বলছেন, প্রাকৃতিক খাবারের প্রতি ঝোঁক বাড়ালে ক্যানসারের ঝুঁকি ৩০–৪০% পর্যন্ত কমানো সম্ভব।

বিষয় : স্বাস্থ্য সচেতনতা ফুসফুস ক্যানসার প্রক্রিয়াজাত খাবার অস্বাস্থ্যকর খাবার

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক প্রথম সংবাদ

মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫


ফুসফুস ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায় যেসব খাবার

প্রকাশের তারিখ : ২৯ অক্টোবর ২০২৫

featured Image

ধূমপান দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুস ক্যানসারের প্রধান কারণ হিসেবে পরিচিত। তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, ধূমপান না করলেও শুধু খাদ্যাভ্যাসের কারণেই ফুসফুস ক্যানসারের ঝুঁকি ৪১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
গবেষণাটি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হেলথ অ্যান্ড নিউট্রিশন একজামিনেশন সার্ভে-এর তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে পরিচালিত হয় এবং এর ফলাফল প্রকাশ করেছে সিএনএন ও জাতিসংঘের ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন (FAO)।

অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার: নীরব ঘাতক

বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার (Ultra-processed foods) হলো সেইসব খাবার, যেগুলোতে থাকে এমন উপাদান যা সাধারণ রান্নাঘরে ব্যবহার করা হয় না।
এই খাবারগুলোতে সাধারণত পাওয়া যায় –
  • কৃত্রিম রং ও ঘ্রাণ
  • সংরক্ষক পদার্থ
  • স্বাদ বাড়াতে রাসায়নিক সংযোজন
  • ইমালসিফায়ার
  • পরিবর্তিত চিনি, লবণ ও চর্বি
এই উপাদানগুলো সাধারণত দেখা যায় সফট ড্রিংকস, প্যাকেটজাত স্যুপ, চিপস, আইসক্রিম, সসেজ, ফাস্ট ফুড, এবং চিকেন নাগেটস–এর মতো খাবারে।

গবেষণার ফলাফল কী বলছে

গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দিনে তিনবারের মতো প্রক্রিয়াজাত খাবার খান, তাদের ফুসফুস ক্যানসারের ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি।
এমনকি বয়স, ওজন বা ধূমপানের ইতিহাস বিবেচনায় নেওয়ার পরও এই ঝুঁকি থেকে যায়।
গবেষকরা বলছেন, এই ধরনের খাবার প্রক্রিয়াজাত করার সময় অ্যাক্রোলিন (Acrylin) নামক একটি ক্ষতিকর রাসায়নিক তৈরি হয়, যা সাধারণত তামাক, কাঠ বা রান্নার তেল পোড়ালে উৎপন্ন হয়। এই রাসায়নিক শরীরের কোষে বিষক্রিয়া ঘটিয়ে ক্যানসার সৃষ্টিকারী পরিবর্তন ঘটাতে পারে।

ধূমপান নয়, খাদ্যও হতে পারে ঝুঁকির কারণ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৪ লাখ মানুষ ফুসফুস ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন।
টাফটস ইউনিভার্সিটির ড. ফাং ফাং ঝ্যাং
বলেন,
“ধূমপান নিঃসন্দেহে ফুসফুস ক্যানসারের প্রধান কারণ, তবে আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, ধূমপান না করেও শুধুমাত্র অস্বাস্থ্যকর খাবারের কারণে অনেকেই এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।”
আরেক বিশেষজ্ঞ ড. ডেভিড কাটজ জানান,
“অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারে স্যাচুরেটেড ফ্যাট, চিনি ও লবণ এত বেশি থাকে যে তা শরীরে প্রদাহ সৃষ্টি করে। দীর্ঘ সময় এই প্রদাহ থাকলে ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়।”

শরীরে কীভাবে ক্ষতি করে এই খাবার

অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার শুধু ক্যানসার নয়, বরং শরীরের মাইক্রোবায়োম নষ্ট করে দেয়, যার ফলে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায়।
টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. টম ব্রেনা
বলেন,
“এই খাবারগুলোতে ওমেগা–৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ খুব কম থাকে, অথচ এটি শরীরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাবারের শেলফ লাইফ বাড়াতে গিয়ে ওমেগা–৩ বাদ দেওয়া হয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য বড় ক্ষতি।”

সুস্থ থাকতে কী খাবেন

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, ফুসফুসসহ সার্বিক শরীরের সুস্থতার জন্য যতটা সম্ভব প্রাকৃতিক ও কম প্রক্রিয়াজাত খাবার বেছে নিতে হবে।
যে খাবারগুলো খাওয়া উচিত:

  • তাজা শাকসবজি ও ফল
  • গোটা শস্য (যেমন লাল চাল, ওটস, গম)
  • ডাল, বাদাম ও বীজজাতীয় খাবার
  • পর্যাপ্ত পানি ও ঘরে তৈরি খাবার
যে খাবারগুলো এড়িয়ে চলা উচিত:
  • সফট ড্রিংকস ও ইনস্ট্যান্ট পানীয়
  • প্যাকেটজাত বা ফ্রোজেন ফুড
  • চিপস, বার্গার, পিজ্জা, সসেজ
  • অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও তেল

ছোট পরিবর্তনেই বড় ফলাফল

একদিনে পুরো খাদ্যাভ্যাস বদলানো সম্ভব নয়। তবে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনলেই শরীরে ইতিবাচক প্রভাব দেখা যায়।
[795]
গবেষকরা বলছেন, প্রাকৃতিক খাবারের প্রতি ঝোঁক বাড়ালে ক্যানসারের ঝুঁকি ৩০–৪০% পর্যন্ত কমানো সম্ভব।


দৈনিক প্রথম সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈম মাহমুদ
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক প্রথম সংবাদ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

শিরোনাম