শীতে ব্যথা কেন বাড়ে ও সমাধান কী?
শীতের মৌসুম শুরু হলেই অনেকের শরীরে নীরবে বাড়তে থাকে ব্যথা। বিশেষ করে হাত, পা, কোমর, হাঁটু ও ঘাড়ের যন্ত্রণা এই সময় বেশি অনুভূত হয়। চিকিৎসকদের মতে, শীতে সূর্যের আলো কম পাওয়া, শরীরের রক্তসঞ্চালন ধীর হয়ে যাওয়া এবং ভিটামিন ডি-এর ঘাটতির কারণে এই সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে। শুরুতে বিষয়টি তেমন গুরুত্ব না পেলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
শীতকালে ব্যথা বাড়ার পেছনের মূল কারণঅর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ঠান্ডা আবহাওয়ায় শরীর স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি জড়তা অনুভব করে। তাপমাত্রা কমে গেলে পেশি ও জয়েন্ট সংকুচিত হয়ে পড়ে, ফলে চলাচলের সময় অস্বস্তি তৈরি হয়। একই সঙ্গে শীতে বাতাসের চাপ ও অক্সিজেনের পরিমাণ কিছুটা কম থাকায় হাত ও পায়ের দিকে রক্তপ্রবাহ হ্রাস পায়। এর ফলে জয়েন্টে প্রদাহ বাড়ে এবং দীর্ঘস্থায়ী অস্বস্তি তৈরি হয়।আরেকটি বড় কারণ হলো ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি। দিনের আলো কমে যাওয়ায় শরীরে প্রাকৃতিকভাবে ভিটামিন ডি উৎপাদন ব্যাহত হয়। এর প্রভাব পড়ে হাড়ের গঠন, ক্যালসিয়াম শোষণ এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর। চিকিৎসকেরা জানান, অনেক সময় হাঁটুর যন্ত্রণা বা পিঠের অস্বস্তির মূল কারণ হিসেবে এই ঘাটতিই ধরা পড়ে।
ভিটামিন ডি ও শীতকালীন শারীরিক সমস্যাশীতকালে ভিটামিন ডি কমে গেলে শুধু হাড় নয়, সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব পড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর অভাবে শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে, মাংসপেশি দুর্বল হয় এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ভিটামিন ডি পর্যাপ্ত থাকলে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী থাকে, যা বিভিন্ন ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধেও সহায়ক।
শীতে ব্যথা প্রতিরোধে খাদ্যাভ্যাসের ভূমিকাচিকিৎসকদের মতে, শীতকালে খাদ্যতালিকা ঠিকভাবে সাজাতে পারলে অনেকাংশে এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। ফ্যাটি মাছ যেমন স্যামন, টুনা বা সার্ডিন নিয়মিত খেলে শরীরে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ডি পাওয়া যায়। ডিমের কুসুম, ফোর্টিফায়েড দুধ ও দইও এই ঘাটতি পূরণে সহায়ক। যারা নিরামিষভোজী, তাদের জন্য রোদে শুকানো মাশরুম একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে।
দৈনন্দিন অভ্যাসে কী পরিবর্তন আনবেনবিশেষজ্ঞ ডা. কৃষ্ণ প্রিয় দাশের মতে, শীতকালে শরীর সচল রাখা অত্যন্ত জরুরি। দীর্ঘ সময় এক জায়গায় বসে না থেকে হালকা নড়াচড়া করলে জয়েন্ট নমনীয় থাকে। ব্যথার জায়গায় দিনে অন্তত দুইবার গরম সেঁক দিলে আরাম পাওয়া যায়। পাশাপাশি পর্যাপ্ত গরম পোশাক পরা ও ঠান্ডা এড়িয়ে চলা প্রয়োজন।
কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেনশীতে সামান্য অস্বস্তি স্বাভাবিক হলেও দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা চলতে থাকলে তা অবহেলা করা উচিত নয়। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, যদি নিয়মিত যত্ন নেওয়ার পরও উপসর্গ কমে না, তবে দ্রুত অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। কারণ অনেক সময় এই উপসর্গের পেছনে গুরুতর রোগ লুকিয়ে থাকতে পারে।[1274]সব মিলিয়ে বলা যায়, শীতকালে ব্যথা বাড়ার বিষয়টি স্বাভাবিক হলেও সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত হালকা ব্যায়াম ও সচেতন জীবনযাপনের মাধ্যমে এটি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে ভবিষ্যতে হাড় ও জয়েন্টের জটিলতা এড়ানো যায়।