বাংলাদেশ শনিবার, ২০ জুলাই, ২০২৪, ৫ শ্রাবণ ১৪৩১

যে গল্প হার মানায় সিনেমাকেও

দৈনিক প্রথম সংবাদ ডেস্ক

প্রকাশিত: মার্চ ৯, ২০২৪, ১০:৪২ পিএম

যে গল্প হার মানায় সিনেমাকেও

শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে ঢাকা ছাড়তে দেরি হয় ট্রেনটির। যথাসময়ে ছাড়লে যেটি পৌঁছাত বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে।  কিন্তু ভাগ্য এতই খারাপ, পথিমধ্যে ধূমকেতুর ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ে। ট্রেনে থাকা শিক্ষার্থীরা তখন ধরেই নিয়েছিলেন, জীবনের মহাগুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাটা হয়তো দেওয়া হচ্ছে না

 

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল ৫ মার্চ দুপুর সাড়ে ৩টায়। এ পরীক্ষায় অংশ নিতে এদিন সকাল ৬টায় ‘ধূমকেতু এক্সপ্রেস’ ট্রেনে ওঠেন ‘সি’ ইউনিটের চতুর্থ শিফটের ৭০০ ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী। কিন্তু শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে ঢাকা ছাড়তে দেরি হয় ট্রেনটির। যথাসময়ে ছাড়লে যেটি পৌঁছাতো বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে। কিন্তু ভাগ্য এতই খারাপ, পথিমধ্যে ধূমকেতুর ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ে। ট্রেনে থাকা শিক্ষার্থীরা তখন ধরেই নিয়েছিলেন, জীবনের মহা গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাটা হয়তো দেওয়া হচ্ছে না। কিন্তু ‘দ্য রেলওয়ে ম্যান’ অসীম কুমার তালুকদারের আন্তরিকতার প্রচেষ্টায় শেষ পর্যন্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পান তারা। তার এই বহুমাত্রিক উদ্যোগ যেন সিনেমার গল্পকেও হার মানায়। ভর্তিচ্ছু, অভিভাবক ও সব মহলের প্রশংসায় ভাসছেন এই রেল কর্মকর্তা। তিনি পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক অসীম কুমার তালুকদার।

 

সেদিন রাতেই রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে বিষয়টি নিশ্চিত করে পোস্টে তিনি লেখেন, ‘প্রায় ৭০০ ছাত্রছাত্রীর ‘ধূমকেতু এক্সপ্রেস’ ট্রেনে ঢাকা থেকে রাজশাহীতে গিয়ে বিকাল সাড়ে ৩টার ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার কথা। রেল ব্রোকেনের জন্য ধূমকেতু এক্সপ্রেস ঢাকা থেকেই বিলম্বে রওনা হয়।  বেলা ১১টায় হিসাব করে দেখা গেল, ট্রেনটি বিকাল ৩টা নাগাদ রাজশাহী পৌঁছাবে।’

ভর্তিচ্ছুরা জানান, তখন থেকেই কাজ শুরু করেন অসীম কুমার। পরীক্ষার্থীদের সময়ের ব্যাপারে চিন্তা করে ধূমকেতু এক্সপ্রেসকে এগিয়ে নিয়ে আসেন অন্য কয়েকটি ট্রেনকে বসিয়ে রেখে। কিন্তু বিধিবাম! লাহেড়ী মোহনপুর স্টেশনে এসে ধূমকেতুর ইঞ্জিন ফেল করে। ফলে ট্রেনটির চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। এরপর শরৎনগরে থাকা ‘চিলাহাটি এক্সপ্রেস’ ট্রেনটির ইঞ্জিন কেটে এনে ধূমকেতু এক্সপ্রেসে প্রতিস্থাপন করা হয়। আবার চালু হয় ট্রেনটি। এত প্রচেষ্টার পরও দেখা যায়, ট্রেনটি বিকাল ৪টায় রাজশাহী স্টেশনে পৌঁছায়। কিন্তু ততক্ষণে পরীক্ষা শুরু হয়ে যাওয়ার কথা।

উপায় না দেখে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তারকে পরীক্ষার সময় পিছিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানান অসীম। আন্তরিক যোগাযোগ রাখেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যও। ফোন করে জেনে নেন ট্রেনের খবর। সময় বাঁচাতে আড়ানি স্টেশনের স্টপেজে ট্রেন না থামানোর নির্দেশ দেন অসীম কুমার।

পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনে ট্রেনটি পৌঁছে বিকাল ৩টা ৩৮ মিনিটে। ভিসির কাছে ‘লেট এন্ট্রি’র বিশেষ অনুরোধ করেছিলেন অসীম। পরীক্ষা শুরু হয়ে গেলেও তাই শুধু তাদের জন্য হলে প্রবেশের সময়সীমা বাড়ানো হয়েছিল আরও ২০ মিনিট। পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক অসীম কুমার তালুকদার বলেন, একটা ঝুঁকি নিয়েই ফেললাম। ওরা আমাদের সন্তান। আর গত বছর আমার সন্তানের ভর্তি পরীক্ষার সময় দৌড়াদৌড়ির অভিজ্ঞতা আমার হয়েছিল।

তিনি বলেন, আমার পুরো টিম দায়িত্ববোধ নিয়ে আগ্রহ সহকারে এই শিক্ষার্থীদের কথা ভেবেছে। উপাচার্য নিজেও অনেক সহানুভূতিশীল হয়ে আমাদের উৎসাহ দিয়েছেন। ট্রেনের অন্য যাত্রীরাও সহায়তা করেছে।

ভর্তি পরীক্ষার শেষের দিন বুধবার প্রেস ব্রিফিংয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার বলেন, দুর্ভোগ বলেকয়ে আসে না। ইঞ্জিন নষ্ট হওয়ায় ঠিক সময়ে ট্রেনটি আসতে পারেনি। ওই ট্রেনে মঙ্গলবারের ‘সি’ ইউনিটের চতুর্থ শিফটের ১২৫ জনের মতো ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী ছিল। পরীক্ষা শুরুর ২০ মিনিট পর পরীক্ষার্থীরা কেন্দ্রে প্রবেশ করতে চাইলে মানবিক বিবেচনায় তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয় বলে জানান তিনি।

Link copied!

সর্বশেষ :